আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতায় বেশকিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের রাজনীতি, গণসংযোগ এমনকি একটি ছাত্রসংগঠনের ব্যানারে অসহায়দের দুঃস্থদের শীতবস্র বিতরণের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার হতে দেখেছি। ‘জয় বাংলা’ – যে স্লোগানের প্রেরণায় আজ আমরা স্বাধীন, সেই স্লোগান দেয়ার অপরাধে বহিষ্কার হতে দেখেছি।
কতটুকু দৃষ্টটা, স্বেচ্ছাচারিতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না থাকলে এমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। দুই একটা ছাড়া মুলত সব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসায়ীদের মালিকানাধীন। আপাতদৃষ্টিতে সাধারন শিক্ষাত্রীদের মনে হতেই পারে, তাদের ইন্ধনদাতা, মদদদাতা ও পৃষ্ঠপোষকতাকারীদের হাত অনেকদূর বিসৃত।

শিক্ষাবেচা বণিক।

বাংলাদেশ প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি এক্ট ২০১০,[1] যে আইনের আওতাধীন হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনুমোদিত ও পরিচালিত হচ্ছে, সেখানে কোথাও উল্লেখ নেই যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ অথবা বেআইনি।
নিচের পরিসংখ্যানটি লক্ষ্য করুন। তথ্যসূত্রঃ ইউজিসি [2]
  • বর্তমানে বাংলাদেশে বেসসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা সর্বমোট ৩,৩০,৭৩০ জন।
  • ২০১৪ সালে বাংলাদেশে শুধুমাত্র বেসসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হয়েছে ১,২১,১৯৪ জন ছাত্রছাত্রী।
  • একই বছরে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ২১,৮৫৬ লক্ষ টাকা আর ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির আয় দেখানো হয়েছে ৯০২১ লক্ষ টাকা।
  • প্রকাশনা ও গবেষণা খাতে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ব্যয় করেছে ৫৪ লক্ষ টাকা আর ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ব্যয় করেছে ৩৯৯২ লক্ষ টাকা।
লক্ষ্য করবেন পরিসংখ্যানটির শেষেরদিকে দুইটি ইউনিভার্সিটির আয়-ব্যয় এর কিছু পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি পরিচালিত হয় এনএসইউ ট্রাস্টের এর অধীনে অপরটি ব্র্যাক ফাউন্ডেশনের অধীনে। অবচেতন মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে এ কিভাবে সম্ভব? কেন আয়ের তুলনায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি গবেষণা খাতকে নিয়ে নিতান্তই প্রহসন করেছেন?
সব সম্ভব!  কারন লক্ষ্য এবং উদ্দ্যেশ্য সবার এক থাকে না, অনেক সময় ইহা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত হয়। এখন ধরুন আমি প্রশ্ন করলাম, কেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি গবেষণাখাতে আরো বেশী ব্যয় করছে না? উত্তর হতে পারে, আমরা পূর্বাচলে ২০০ একর জমি কিনেছি, আমাদের ক্যাম্পাসের মেইনটেনেন্স খরচ বেশী ইত্তাদি। আমি সন্তুষ্ট না হয়ে আবার প্রশ্ন করি, সেক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থায় (ব্যাংক লোন অথবা সরকারি অনুদান) না করে কেনইবা গবেষণা খাতকে এতটা রূড়ভাবে অগ্রাহ্য করা হলো ?…এভাবে প্রশ্নোত্তরের পালাবদল চলতেই থাকলো।
কিন্তু মজার ব্যপার হলো, এধরণের প্রশ্ন, আলোচনা, বিতর্ক দূরে থাক সাধারন শিক্ষাত্রীদের নুন্যতম কৌতূহল পুরণের কোন সুযোগ শুধু নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি নয় কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই নেই। এখানে মত প্রকাশ অথবা মত প্রকাশের উদ্দেশে যেকোন ধরনের জামায়াতের প্রচেষ্টা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হবার মতো অপরাধ। আর আমরা ছাত্ররা এখানে পূরো মানি মেকিং সিস্টেমের একটা এলিমেণ্ট মাত্র।
ভাবতেই খারাপ লাগে যে গুলশানে নিরীহ ব্যক্তিদের হত্যা, ঈদের দিন ঈদের জামায়তে মুসল্লিদের উপর বোমা হামলাকারীরা অথবা পরিকল্পনা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র অথবা শিক্ষক। তাদেরকে নিজের বাসা ভাড়া দিয়ে আশ্রয় দেয়া ও সেই তথ্য গোপন করার অভিযোগে আমার প্রিয় শিক্ষাঙ্গনের প্রোভিসি গ্রেফতার। ব্লগার নিলয় হত্যার প্রত্যক্ষ আসামী এই শিক্ষাঙ্গনের ছাত্র। ওরা যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেই নিজেরা পরিচিত এবং সংগঠিত হয়েছে একথা তদন্তে বের হয়ে এসেছে। আর সেক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের অথরিটি অথবা অথরিটির কোন অংশ জড়িত কিনা সেটা আরো তদন্ত সাপেক্ষে জানা যাবে। যে লাইব্রেরীতে বসে ছাত্ররা পড়াশুনা করে, গ্রুপ ডিসকাশন করে অথবা যে বয়েজ লাউঞ্জে ছাত্ররা লাঞ্চ করে, বিশ্রাম নেয় অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো জায়গায় বসে যে তারা এহেন ন্যাক্কারজনক কাজের পরিকল্পনা করেনি সেকথা কি নিশ্চিতভাবে বলা যায়?
আর তাই নর্থ সাউথ বিতর্কে আমার অবস্থান নৈতিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় অথরিটির বিপক্ষে যদিও এহেন উচ্যবাচ্চ্যের জন্য আমাকেও যে বহিষ্কার করবেন না তাও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। সে যাই হোক, আর চুপ করে বসে থাকা যায় না। চুপ থাকা আর জঙ্গিবাদের মতো এধরনের ঘৃণ্য অপরাধকে সমর্থন করা এক কথা।

ছাত্র রাজনীতির ভয় ও ভীতি সমাচার।

যারা ছাত্র রাজনীতিকে বাঁকা চোখে দেখছেন তাঁরা স্রেফ ফ্রেমিং কনসেপ্ট এ বিশ্বাসী, পেসিমিস্ট। মূদ্রার যেমন এপিঠ আছে তেমনি ওপিঠও আছে। বরং ছাত্র রাজনীতি না থাকার সুযোগেই জঙ্গিরা ও তাদের মদদদাতারা এভাবে সংগঠিত হবার সুযোগ পাচ্ছে। পাঠ্যবইয়ের বাইরে প্রত্যেকের একধরনের আলাদা জগত অথবা স্বত্বা থাকে। তরুণদের ক্ষেত্রে সেই স্বত্বার থাকে নিজস্ব মতবাদ, স্পৃহা আর অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মতো অসামান্য প্রতিভা। সুস্থ্য রাজনৈতিক চর্চা না থাকায়, জঙ্গি মদদদাতাদের এই আগুনে ঘি ঢালার জন্য নিরঝঞ্জাট ও সর্বোৎকৃষ্ট শস্যক্ষেত্র এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। জঙ্গিবাদ একধরনের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। এগুলো রোধ করতে ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, বিশ্ববিদ্যালয় অথরিটি ও সরকারের সমন্বিত পদক্ষেপ এবং মতানৈক্য প্রয়োজন।
সবার মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে বলছি, বিচ্ছিন্নভাবে বাইরে যা হচ্ছে এখানে সেরকম হবে তা ভাবার কোন কারন নেই। এখনকার ছাত্রছাত্রীদের চিন্তাভাবনা অনেক ইনোভেটিভ এবং অনেক আধুনিক। দূরদর্শীতামূলকভাবে চিন্তা করলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকলে এখানে অনেক ভালোকিছু করা সম্ভব যা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছে দৃষ্টান্ত হতে পারে। সর্বোপরি রাজনীতি করতে যেই আসুক না কেন তাঁদেরকে ছাত্রদের নিয়েই রাজনীতি করতে হবে এবং শিক্ষার মান উন্নয়ন ও ছাত্রদের স্বার্থের জন্যই রাজনীতি করতে হবে। সেক্ষেত্রে ভালোকিছু যে হবে না এমন নিশ্চয়তা কি কেও দিতে পারবেন?
বিশ্বাস করুন, কোন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কখনো টেন্ডারবাজী, চাদাবাজী করবে না। কারন কাদের সাথে করবে? এখানে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশের সুযোগ নেই এবং অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালগুলো সকল নির্বাহী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় বোর্ড অব ট্রাস্টের মাধ্যমে এবং সেমতে ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার জন্য হাইলি কোয়ালিফাইড কর্পোরেট বডি কাজ করে। সর্বোপরি সাধারন ছাত্রদের এধরণের ব্যবসায়িক প্রেক্ষাপটে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সামাজিক, পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও সমসাময়িক পরিস্থিতি চিন্তা করে বলা যায় তারা কখনই ওইপথে পা বাড়াবেন না।
ছাত্রছাত্রীদের গণতন্ত্র চর্চার উদাহরণ হিসেবে “স্টুডেন্ট ইউনিয়ন/কাউন্সিল” সহজ বাংলায় ছাত্র সংসদ” সারাবিশ্বে বহুল প্রচলিত একধরনের ব্যবস্থা। বিশ্বের অনেক খ্যাতনামা রাজনীতিবিদদের রাজনীতির হাতেখড়ি এই স্টুডেন্ট কাউন্সিল। আমেরিকায় প্রায় প্রত্যেক সরকারি অথবা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এধরণের প্রচলন রয়েছে। এই ব্যবস্থায় ছাত্রদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ছাত্রনেতাদের নিয়ে ডামি সংসদ’ [রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আইনপ্রণেতাদের আদলে একধরনের মঞ্চায়ন।] গঠিত হয়। সেখানে বিতর্ক হয়, সেমিনার হয়। ছাত্ররা তাঁদের অনেকধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনার সুযোগ পায়। এভাবে ধীরে ধীরে একজন ছাত্রনেতা ভবিষ্যৎ নেতৃত্তের দিকে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে অগ্রসর হতে পারেন। সেখানকার সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবে বাস্তবায়ন হোক বা না হোক, ছাত্রদের মতামত প্রকাশের একটা গ্রহণযোগ্য মাধ্যম হিসেবে পরিনত হতে পারে। সেক্ষেত্রে মেধাবীরা রাজনীতিতে আগ্রহী হবে এবং তাঁদের অংশগ্রহন সামগ্রিকভাবে দেশকে সমৃদ্ধ করবে।
বাংলদেশে প্রায় সকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আমেরিকান এডুকেশন পলিসি ফলো করেন। এতদসত্তেও এধরনের নুন্যতম সুযোগ না থাকা অনেকভাবেই ইঙ্গিতপূর্ণ হতে পারে।
  • বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মালিকপক্ষ কখনোই চান না যে ছাত্রছাত্রীরা সংগঠিত হোক।
  • যে Code of Conduct এর দোহাই দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে তা স্রেফ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সৃষ্ট একধরনের বিধিব্যবস্থা, সরকারি কোন নীতিমালার ভিত্তিতে এটি তৈরি করা হয় নি।
  • বাণিজ্যিক স্বার্থেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মালিকবৃন্দ সম্মিলিতভাবেই এধরনের সুযোগ প্রতিহত করছে্ন।
  • ছাত্রছাত্রীদের পড়াশুনার ক্ষতি হবে এধরনের প্রচার করলেও বাস্তবতা হলো তারা শিক্ষাত্রী ও অভিভাবকদের মানবিক দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছেন।
রাস্ট্রের ভবিষ্যৎ নেতৃত্তের বিকাশ, শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা সর্বোপরি তরূণদের জঙ্গিবাদের মতো বীভৎস অভিশাপ থেকে মুক্তির পথ রাষ্ট্রকেই তৈরী করতে হবে। রোধ করে রাখা মত প্রকাশের স্বাধীনতার রক্তাক্ত প্রতিদান জাতি দেখেছে। পথরোধ করে ভালো কিছু আশা করা যায় না। ৩,৩০,৭৩০ জন ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে কোন একজন যে একদিন এদেশে ভবিষ্যত নেতৃত্তের অংশীদার হতে পারতো সেতো অসম্ভব কিছু নয়। বাণিজ্যিক স্বার্থে সেই পথকে যারা কন্টকাচ্ছন্ন করে রেখেছেন তাঁরা দেশ ও জাতির যে কতো ক্ষতি করেছেন এবং প্রতিনিয়ত করছেন সেকথা ভাবার কি কেও নেই?

রেফারেন্স –

  1. প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি এক্ট ২০১০, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।
  2. বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৪।

 

 

Advertisements

Comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s